নতুন বছরে ব্যাংক খাতে নতুন প্রত্যাশা

0
243
প্রিন্ট

রেজাউল করিম খোকন :

দেশের অর্থনীতির স্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে শুরু হলো নতুন বছর। আমাদের রপ্তানি খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে, প্রবাসী আয়ও কয়েক বছরের মন্দা ভাব কাটিয়ে রীতিমতো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত খুবই ভালো অবস্থায় রয়েছে বর্তমানে। বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব আসছে বিপুল পরিমাণে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে এবং পরবর্তী সময়ে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা স্বস্তি দিচ্ছে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের। এমনই এক সুখকর, স্বস্তিদায়ক অবস্থায় দেশে টানা তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ করছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার।

২০১৮ সালের পুরোটাই ব্যাংক খাতে ছিল নানা অস্থিরতা। তারল্য সংকটের কারণে অনেক ব্যাংক ঋণ দেওয়া বন্ধ রেখেছিল। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও নানা সংকট ছিল। খেলাপি ঋণেও লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছিল না। শেয়ার বাজার থেকেও ব্যাংকগুলো ভালো মুনাফা করতে পারেনি। তবে আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকগুলোর ভালো ব্যবসা হয়েছে। বিদায়ী বছরে অর্থাত্ ২০১৮ সালের শেষে দেশের অধিকাংশ বাণিজ্যিক ব্যাংকে বেড়েছে পরিচালন মুনাফা। বিভিন্ন ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এবার ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফার বড় অংশই এসেছে কমিশন, সার্ভিস চার্জ, বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবসার আয় থেকে।

আমদানি কমায় ২০১৮ সালে স্বস্তি ফিরে এসেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। কিন্তু ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা কাটেনি, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছাড়িয়েছে এক লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। বছরের একেবারে শেষে এসে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আবারও পাঁচ বছর দেশ শাসনের সুযোগ পেয়েছে। ‘সমৃদ্ধির পথে অগ্রযাত্রা’ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি ছিল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের ইশতেহারের মূল কথা। একটা বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, নির্বাচনের বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভালোই গেছে। নির্বাচনের বছর ঘিরে অর্থনীতিতে উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা ছিল। তারপরেও বলতে হয়, ব্যাংক খাতে ক্রনিক রোগের মতোই খেলাপি ঋণ বেড়ে চলেছে। সুশাসনেও ঘাটতি রয়ে গেছে ব্যাংক খাতে। যথেষ্ট সংখ্যক ব্যাংক থাকার পর নতুন আরো কয়েকটি ব্যাংক আসছে সরকারি অনুমোদন পেয়েছে। নতুন বছরে নতুন সরকারকে এদিকে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে খেলাপী ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা এবং দেউলিয়া আইন বাস্তবায়নের টেকসই ও কার্যকর পদ্ধতি নির্ণয় করা হবে। বাজার ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিচক্ষণতার সাথে নির্দিষ্ট পদ্ধতি ব্যবহার করে সুদের হার নিয়ন্ত্রণে রাখবে। ঋণ অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ে দক্ষতা এবং গ্রাহকের প্রতি ব্যাংকের দায়বদ্ধতা পরিবীক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক পদক্ষেপ নেবে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে নতুন সরকারকে শুরু থেকে সাহসের সঙ্গে কয়েকটি কাজ করতে হবে।

আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে যে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে, সেই তিনটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করলেই বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে যে উন্নয়ন হয়েছে তার চেয়েও বেশি গতি সৃষ্টি হবে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায়। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। জনবান্ধব প্রশাসনের কথা বলা হয়েছে। আর সুশাসন নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে যে আস্থাহীনতা, অনিশ্চয়তা, শঙ্কাবোধ, অস্থিরতা ভাব বিরাজমান রয়েছে এটা সরকারের অর্জিত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সাফল্যকে ম্লান করে দিতে পারে যদি না ব্যাংকিং খাতে সুশাসন সুনিশ্চিত করা না যায়। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, আগামী পাঁচ বছরে আর্থিক খাতে ফিরিয়ে আনা হবে।

আগামী পাঁচ বছর সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দারিদ্র্য দূরীকরণে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। অর্থমন্ত্রী আরো বলেছেন, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে অসাধ্য সাধন করবে। আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে নতুন সরকারের প্রধান কাজ। সরকারের ধারাবাহিকতা থাকার ফলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো ঠিকঠাক মতো চলবে। পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র, মেট্রো রেল, কর্নফুলি টানেল এর মতো বৃহত্ উন্নয়ন কর্মযজ্ঞগুলো যথাসময়ে সম্পন্ন হয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে সমৃদ্ধির নতুন মাত্রা সংযুক্ত হবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। নতুন বছরে ব্যাংক খাতে তারল্য ব্যবস্থাপনা একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনার ঘোষণা বাস্তবায়ন না হলে তা হবে এক ধরনের প্রতারণা।

নতুন বছরে নতুন সরকারের হাত ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুধু প্রবৃদ্ধিই নয়, অন্যান্য সূচকের ওপরও নির্ভর করে অর্থনৈতিক ভিত্তি। ফলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সরকারকে দিতে হবে সর্বোচ্চ নজর। ব্যাংক খাতের সংস্কার ও ঋণ খেলাপীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজস্ব আহরণের গতি বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।