খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ঋণের সুদহার কমান: অর্থমন্ত্রী

0
181
প্রিন্ট

নবনিযুক্ত অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টেনে ঋণের সুদহার কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে ঋণের সুদহার কমাতে কম সুদে আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্র তৈরি করতে বলেন। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান বাড়ানোর জন্য বিকল্প তহবিল সৃষ্টির পথ খোঁজা এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন তিনি।

গত রোববার বিকালে অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরসহ ব্যাংকের শীর্ষপর্যায়ের কয়েক কর্মকর্তাকে ডেকে এসব নির্দেশনা দেন। খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রচলিত আইন সংশোধনের বিষয়েও কথা বলেছেন তিনি। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকটি বিভাগ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর কী পরিমাণ তহবিল আটকে আছে, সেগুলো কীভাবে সচল করা যায়, সকল বিষয়ে কাজ শুরু করেছে।

খেলাপি ঋণ আদায় বাড়াতে অর্থঋণ আদালত ও দেউলিয়া আদালত আইনের প্রয়োগ আরও কঠোর করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সংশোধিত খসড়া প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। সেটি নিয়েও নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের জিডিপির আকার বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে। এতে ঋণের চাহিদাও বাড়লেও সে তুলনায় জিডিপির শতকরা হারে সঞ্চয় বাড়েনি।

এছাড়া খেলাপি ঋণ বাড়ায় ব্যাংকিং খাতে তহবিলের সংকট দেখা দিয়েছে। যে কারণে ঋণের সুদের হার কমছে না। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা অনুযায়ী জোগান দিতে পারছে না ব্যাংকগুলো ।

জাল-জালিয়াতির কারণে কিছু অখ্যাত শিল্পগ্রুপ মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে কয়েকটি ব্যাংককে বিপাকে ফেলেছে। এর মধ্যে রয়েছে জনতা ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক। ফলে এসব ব্যাংকও তহবিল সংকটে ভুগছে। অন্যান্য ব্যাংকেও বিনিয়োগ যোগ্য তহবিলের পরিমাণ কমে গেছে। এসব কারণে ঋণের জোগান বাড়াতে সরকারি আমানতের প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বিকল্প উৎস থেকে তহবিল বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, ব্যাংকিং খাতে তারল্য বাড়ানোর চারটি পথ রয়েছে। এর মধ্যে সরকারের রাজস্ব আয়,  অন্যান্য খাত থেকে আয় বাড়লে এবং বৈদেশিক উৎস থেকে সরকারের তহবিলের জোগান বাড়লে, রফতানি আয় ও প্রবাসীদের রেমিটেন্স বাড়লেও ব্যাংকে তারল্য বাড়বে। গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ বাড়লে, খেলাপি ঋণের কারণে আটকে থাকা তহবিল ছাড় করাতে পারলেও ব্যাংকে তারল্য প্রবাহ বাড়াবে।

এসব খাত থেকে দ্রুত তহবিলের জোগান বাড়ানোও সম্ভব হবে না। এজন্য বিকল্প উৎস অর্থাৎ বৈদেশিক ঋণ বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক থেকে তহবিল সংগ্রহ করে তা দিয়ে শিল্প খাতে ঋণ বিতরণের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে বলে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন,  ঋণের সুদের হার কমানোর উদ্যোগটি প্রক্রিয়াধীন আছে। এটি নিয়ে এখনও কাজ হচ্ছে। আশা করি সামনে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।

সূত্র জানায়, খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর এখন মোটা অঙ্কের তহবিল আটকে রয়েছে। এর মধ্যে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর বড় অংশই মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে। মন্দ ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়। সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ, নিুমান ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ প্রভিশন রাখতে হয়। এসব মিলে ব্যাংকগুলোর প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা আটকে আছে। রাইট অফ করা ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা। নিয়ম অনুযায়ী শতভাগ প্রভিশন রেখে ঋণ রাইট অফ করতে হয়।

এ হিসাবে ওই ঋণের বিপরীতে আরও ৫৬ হাজার কোটি টাকার তহবিল আটকে আছে। এসব ঋণের বিপরীতে মামলা পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা, জামানত পাহারা দেয়া, আইনজীবী নিয়োগের ক্ষেত্রে আরও অর্থ খরচ হচ্ছে। আমানতের বিপরীতেও গ্রাহকদের সুদ দিতে হচ্ছে নিয়মিত। অথচ এর বিপরীতে ব্যাংকের কোনো আয় নেই। এসবের কারনেও ব্যাংক বিপাকে পড়েছে।

এদিকে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল খেলাপি ঋণ যাতে আর এক টাকাও না বাড়ে, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তা পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসকে (বিএবি)। এরপর থেকে কীভাবে খেলাপি ঋণ কমানো যায় সে পদ্ধতি নিয়ে ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরাও বৈঠক করেছেন।