প্রত্যেক ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা আলাদা হচ্ছে

0
179
প্রিন্ট

ব্যাংকের দুর্নীতি দমন করতে এবং দক্ষতা বাড়াতে প্রতিটি ব্যাংকে ‘কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট’ প্রচলনের নির্দেশ দিয়েছেন নবনিযিুক্ত অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। পাশাপাশি দক্ষতা ও যৌগ্যতা বাড়াতে ব্যাংকের পরিচালক ও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনার কথাও বলেছেন তিনি। এই ‘কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট’এর মূল লক্ষ্যই হচ্ছে ব্যাংকের মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনাকে আলাদা রাখা। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে এসব নির্দেশনা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। নির্দেশনার পর আর্থিক বিভাগ কাজ করতে শুরু করেছে বলে জানা যায়।

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, সদিচ্ছা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা সঠিক হলে অর্থমন্ত্রীর এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারবে এবং ইহা বাস্তবায়ন হলে ব্যাংকিং খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ব্যংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা পৃথক হওয়া দরকার। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে মালিকের সংখ্যাই বেশি। তারা বোর্ড অব ডিরেক্টর হিসেবে আছে এবং ব্যাংকের সবকিছু তারাই করছে। এটি বাস্তবায়নের আগে একই পরিবারের ৩ থেকে ৪ জন পরিচালক থাকার বিধান সংশোধন করা উচিত। এ বিধান সংশোধন না করে অর্থমন্ত্রী তার নির্দেশ কিভাবে বাস্তবায়ন করবেন- তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাত উন্নতির জন্য সুশাসন নিশ্চিত ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।

অর্থনীতিবিদ ও সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট’ সংক্রান্ত অর্থমন্ত্রীর নির্দেশ নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এর অনেক আগেেই ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড এবং ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করে যার যার দায়িত্ব নিরূপণ করে দিয়েছে। কিন্তু সেগুলো কেউ মানেনি। এখন অর্থমন্ত্রীও একই কথা বলেছেন, সেটি যে মানবে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।

তিনি আরও বলেন, এখন দরকার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও সদিচ্ছা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার। কারন নিয়ম কানুন সবই আমাদের ঠিক আছে। তার মতে, যদি কোনো ব্যাংকে পর্ষদের কোনো পরিচালক তার দায়িত্ব সীমার বাইরে এসে ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করে সেক্ষেত্রে ওপরের লেভেল থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এটি না করতে পারলে কোনো লাভ হবে না।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে ব্যাংকিং খাতের অবস্থা, খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক ব্যবস্থাপনাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। ওই সময় তিনি প্রত্যেক ব্যাংকে ‘কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট’ প্রচলনের নির্দেশ দেন।

গত বছর ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে যে নতুন আইন প্রবর্তন করা হয়, সেখানে বলা হয়েছে যে, কোনো ব্যাংক কোম্পানির পরিচালক একনাগাড়ে নয় বছরের বেশি থাকতে পারবেন না। তিন বছর বিরতি দিয়ে আবার নয় বছর থাকতে পারবেন। এভাবে ইচ্ছা করলে কেউ আমৃত্যু পর্যন্ত ব্যাংক পরিচালক থাকতে পারবে। এছাড়া একই পরিবার থেকে চারজন পরিচালক করারও বিধান রাখা হয়। এতে ব্যাংকগুলো হয়ে যায় পরিবারতন্ত্র এবং পরিচালদের ক্ষমতা বেড়ে যায়।

এর আগে বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালকরা তিন বছর করে দুই মেয়াদে টানা ছয় বছর পরিচালক থাকতে পারতেন। দুই মেয়াদ শেষে তিন বছর বিরতি দিয়ে আবারও তিন বছরের জন্য পরিচালক হতে পারতেন। আর একই পরিবারের দু’জনের বেশি পরিচালক থাকতে পারতেন না।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকিং বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকার পরও পরিচালকের পদে আসছেন অনেকে।পারিবারিক প্রতিষ্ঠান মনে করে অনেকই ছাত্রত্ব শেষ না করেই ব্যাংকের পরিচালক হচ্ছেন। ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দিচ্ছেন এবং তিনি নিজেও ঋণ নিচ্ছে ঋণ সংশ্লিষ্ট গ্রহীতা পরিচালকের ব্যাংক থেকে। পরিচালকদের যোগসাজশে এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত দেখা যায় এসব পরিচালকের নামে বেনামে নেয়া ঋণই এক সময় খেলাপি হতে থাকে।

অদক্ষ লোকজন ব্যাংকের পরিচালক পদে বসে যাওয়ার কারণেই ব্যাংকগুলো দেউলিয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। এই নেতৃত্বের অদক্ষতার কারণেই মূলত ব্যাংকিং খাতে ঋণগ্রহীতা চিহ্নিতকরণ, খেলাপি ঋণ আদায় ও লক্ষ্য নির্ধারণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্বচ্ছতা প্রণয়ন সম্ভব হচ্ছে না।