৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ

বাজেট

কভিড-১৯ মহামারীতে অর্থনীতির অচলাবস্থার মধ্যে টিকে থাকা ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা সামনে রেখে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল সোয়া ৩টার দিকে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য এ বাজেট উপস্থাপন শুরু করেন অর্থমন্ত্রী।

এবারের বাজেটে যা থাকছে…

জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ শতাংশ

মহামারি করোনা পরিস্থিতির মাঝেও ২০২০-২১ অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

করমুক্ত আয় তিন লাখ টাকা পর্যন্ত

প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির কারদাতাদের জন্য তিন লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর করহার শূন্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। পরবর্তী এক লাখ টাকা পর্যন্ত ৫ শতাংশ, তার পরবর্তী তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ১০ শতাংশ, তার পরবর্তী চার লাখ টাকা পর্যন্ত ১৫ শতাংশ, তার পরবর্তী পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ২০ শতাংশ এবং তার বেশি টাকা আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ আয়কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

অনলাইন রিটার্নে ২ হাজার টাকা মওকুফ

অনলাইনে রিটার্ন দাখিলকে জনপ্রিয় করতে কর ছাড় দেয়া হয়েছে। যেসব করদাতা অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করবে তাদেরকে ২ হাজার টাকা কর ফেরত দেয়া হবে। যা আয়কর বিভাগের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে। টিআইএন থাকলেই রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক: সব টিআইএনধারীদের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে রিটার্ন জমার সংখ্যা বাড়ে এবং কর ফাঁকি বন্ধ হবে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি সব শ্রেণির করদাতাদের সুবিধার্থে রিটার্ন জমার ফরম সহজ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছর থেকে কম আয়ের লোকজন এক পৃষ্ঠার ফরমে রিটার্ন জমা দিতে পারবেন।

দাম কমতে পারে যেসব পণ্যের…

করোনা মোকাবেলায় পরীক্ষার কিট, স্বাস্থ্য সুরক্ষার মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, পিপিই, আইসিইউ যন্ত্রপাতি ও ওষুধে আমদানি, উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূসকে ছাড় দেয়া হয়েছে। ফলে এসব পণ্যেরও দাম কমতে পারে।

দেশীয় শর্ষের তেলে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। স্বর্ণ আমদানিতে, অটোমোবাইল, ফ্রিজ,  এসির ওপর মূসক অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। ডিটারজেন্টের কাঁচামালের ওপর শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপারের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা বাড়ানো হবে। ইস্পাত শিল্পের রিফ্রাক্টরি সিমেন্টের ওপর শুল্ক কমানো হবে। এলপিজি সিলিন্ডারের দাম কমতে পারে। রেফ্রিজারেটর ও এসির কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে।

করোনা পরিস্থিতিতে বাজেটে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়াও কৃষি উৎপাদনে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতির দাম কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। কৃষিযন্ত্রের মধ্যে প্যারাফিন ওয়াক্স, হস্তচালিত কৃষি যন্ত্র, বৈদ্যুতিক সিগন্যালিং পণ্য এবং রেগুলেটরি ডিউটি হ্রাসের ফলে শিল্পের জন্য ইথিলিন বা প্রোপিলিন, আর্টিফিশিয়াল গার্টস ইত্যাদির দাম কমতে পারে।

এছাড়াও রসুন, চিনি ও পোল্ট্রি শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে আরোপিত ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী জুতার দাম কমবে। এ বাজেটে জুতা ও জুতা তৈরির কাঁচামালেরর উপর আরোপিত শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। জুতা তৈরি শিল্পে ব্যবহৃত সব ধরনের উপকরণে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে জুতার দাম কমবে।

দাম বাড়তে পারে যেসব পণ্যের…

যেসব পণ্যের দাম বাড়বে তার মধ্যে রয়েছে- আমদানি করা পেঁয়াজ, প্রসাধনী সামগ্রী, মোবাইল ফোন সেবা খরচ, ইন্টারনেট সেবা, বিড়ি ও সিগারেট, আলোকসজ্জা সামগ্রী, গাড়ি রেজিস্ট্রেশন খরচ, গাড়ি, শ্যাম্পু প্রভৃতি।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লঞ্চের টিকিট খরচ বাড়বে। আগে ৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর ছিল, নতুন অর্থবছরে তা বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। চার্টার্ড বিমান ও হেলিকপ্টার ভাড়ার ওপর সম্পূরক শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রসাধনসামগ্রীর ওপর সম্পূরক শুল্ক ৫ থেকে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আসবাব কেনায় মূসক বেড়েছে। ৫ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। মোবাইল ফোনে কথা বলার ওপর কর বাড়ছে। কার ও জিপ রেজিস্ট্রেশনসহ বিআরটিএ প্রদত্ত অন্যান্য সার্ভিস ফির ওপর সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সিরামিকের সিঙ্ক বেসিনের ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। মধুর বাল্ক আমদানি শুল্ক বাড়ছে। বিদেশি মধুর দাম বাড়বে।

অর্থ পাচার করলে ৫০ শতাংশ কর

দেশ থেকে আন্ডার ইনভয়েসিং, ওভার ইনভয়েসিং এবং ভুয়া বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থ পাচার ও কর ফাঁকির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ ধরনের প্রবণতা রোধ করতে যে পরিমাণ অর্থ  আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিং করে পাচার করা হয়েছে এবং যে পরিমাণ প্রদর্শিত বিনিয়োগ ভুয়া হিসেবে প্রমাণিত হবে তার উপর ৫০ শতাংশ হারে করারোপ করা হবে।

থাকছে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ

প্রস্তাবিত বাজেটে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অপ্রদর্শিত সম্পদে নির্ধারিত হারে এবং অপ্রদর্শিত অর্থে ১০ শতাংশ কর প্রদান করলেই এ নিয়ে আর কোন পক্ষ প্রশ্ন করবে না- এমন প্রস্তাবনা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের প্রচলিত আইনে যা–ই থাকুক না কেন, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের প্রতি বর্গমিটারের ওপর নির্দিষ্ট হারে এবং নগদ অর্থ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড বা যেকোন সিকিউরিটিজের ওপর ১০ শতাংশ কর প্রদান করে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করলে আয়কর কর্তৃপক্ষসহ অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না।’

এ ছাড়া একই সময় ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাগণ পুঁজিবাজারে অর্থ বিনিয়োগ করলে, ওই বিনিয়োগের ওপর ১০ শতাংশ কর প্রদান করলে, আয়করসহ কোনো কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন করবে না।

তালিকাভুক্ত অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট কর কমছে

আসন্ন ২০২০-২১ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এবং অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করের ব্যবধান কমানো হয়েছে। বর্তমানে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির কর ব্যবধান ১০ শতাংশ হলেও প্রস্তাবিত বাজেটে সেটি সাড়ে ৭ শতাংশ নির্ধারিত করা হয়েছে।

বর্তমানে ব্যাংক, লিজিং,বীমাসহ সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফোন কোম্পানি এবং সিগারেট প্রস্তুতকারী কোম্পানি ব্যতীত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে করপোরেট করের হার ২৫ শতাংশ। আর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির করপোরেট করের হার ৩৫ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে এটি কমিয়ে সাড়ে ৩২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

শিক্ষায় বরাদ্দ বেড়েছে ১১.৭৭ শতাংশ

২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৬ হাজার ৪০১ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ৫৯ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। এ হিসাবে আকারের দিক থেকে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে ৬ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা। আর শতাংশের হিসাবে শিক্ষায় বরাদ্দ বেড়েছে ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

ব্যাংকে যত টাকা তত বেশি কর

আগামী ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যতো বেশি টাকা থাকবে ততো বেশি আবগারি শুল্ক দিতে হবে। অ্যাকাউন্টে বছরের যে কোনো সময়ে ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা থাকলে ৩ হাজার টাকা আবগারি শুল্ক হিসেবে কেটে নেয়া হবে। এতদিন নেয়া হতো আড়াই হাজার টাকা।

একইভাবে ১ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা থাকলে ১২ হাজার টাকার পরিবর্তে ১৫ হাজার টাকা কেটে নেয়া হবে। আর ৫ কোটির বেশি টাকা থাকলে ৪০ হাজার টাকা আবগারি শুল্ক আদায় করা হয়েছে, এতো দিন ২৫ হাজার টাকা আদায় করা হতো। তবে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক হিসাবের আবগারি শুল্ক আগের মতো রাখা হয়েছে।

মোবাইলে ১০০ টাকায় ২৫ টাকা নেবে সরকার

বাজেটে মোবাইল সেবার ওপর কর আরেক দফা বাড়িয়েছে সরকার। এই দফায় সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে, যা গত বছরও একই হারে বাড়ানো হয়েছিল।

নতুন করহারে মোবাইল সেবার ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ১৫ শতাংশ, সম্পূরক শুল্ক ১৫ শতাংশ ও সারচার্জ ১ শতাংশ। ফলে মোট করভার দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

এর মানে হলো, প্রতি ১০০ টাকা রিচার্জে সরকারের কাছে কর হিসেবে যাবে ২৫ টাকার কিছু বেশি। এতদিন তা ২২ টাকার মতো ছিল। বিশ্লেষকেরা এবং কোম্পানিগুলো বলে আসছিল, মোবাইল সেবায় কর বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষ চাপে বেশি পড়বে।

image_printপ্রিন্ট করুন
শেয়ার করুনঃ