জেনে নিন করোনাভাইরাসের জরুরি সব তথ্য

সারাবিশ্বে মহামারি আকার ধারন করা করোনাভাইরাস নিয়ে তৈরি হয়েছে অনেক গুজব। কোনটা ভুল তথ্য আর কোনটা সঠিক তা নিয়ে মানুষ পড়েছে বিপাকে। এ কারণে করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্ববাসীরা উদ্বিগ্ন, মানুষের মনে নানা প্রশ্নের বাসাবেঁধেছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের কাছে প্রতিনিয়ত নানা প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইছেন। ভাইরাসটি বিশ্বে নতুন হওয়ায় কেবল গবেষণা শুরু হয়েছে। তারপরও সঠিক সূত্রের বরাত দিয়ে পাঠকদের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছেন গণমাধ্যমটির হেলথ এডিটর সারাহ বোসলে, সায়েন্স এডিটর ইয়ান স্যাম্পল, সায়েন্স করেসপনডেন্টস হানাহ ডেভলিন ও মার্টিন বেলাম। সেখান থেকে জরুরি কিছু প্রশ্নের উত্তর তুলে ধরা হলো।

করোনাভাইরাসের উৎপত্তি:

করোনাভাইরাস প্রথম দেখা যায় চীনে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথমবারের মতো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হন। ওই শহরে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের বাস। উহানের সামুদ্রিক খাবার বিক্রির একটি পাইকারি মার্কেট থেকে করোনাভাইরাস দ্রুত চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার উপসর্গ:

বলা হচ্ছে, করোনাভাইরাস অন্য কোনো প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে কোভিড-১৯ রোগটি সৃষ্টি করে। এই রোগের সাধারণ লক্ষণ হলো জ্বর, ক্লান্ত লাগা, শুকনো কাশি। কারও কারও সর্দি, ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়া, গলাব্যথা ও ডায়রিয়াও হতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত ৮০ ভাগ রোগী কোনো বিশেষ চিকিৎসা ছাড়াই সুস্থ হয়ে ওঠেন। প্রতি ছয় জনে একজন রোগীর অবস্থা গুরুতর হতে পারে। তখন তার বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

যেভাবে সুরক্ষিত থাকা যায়:

বারবার সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে। সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে ভালো করে হাত ধুতে হবে। কোনো কিছু ধরার আগে ও পরে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। হাঁচি ও কাশির সময় টিস্যু ব্যবহার করতে হবে। ব্যবহৃত টিস্যু কোনো ঢাকনাযুক্ত ময়লার ঝুড়িতে ফেলতে হবে। হাতের কাছে টিস্যু না থাকলে হাঁচি ও কাশি দেয়ার সময় মুখ কনুই দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। অপরিষ্কার হাত দিয়ে নিজের চোখ, নাক ও মুখ ধরা থেকে বিরত থাকতে হবে।

যেভাবে কোয়ারেন্টিনে থাকবেন:

এ ক্ষেত্রে একেক দেশ একেক নিয়ম অনুসরণ করছে। তবে সহজ কথা হচ্ছে, যদি বাসায় আপনি একাই থাকেন এবং আপনার যদি কাশি ও উচ্চ মাত্রার জ্বরের লক্ষণ থাকে, তাহলে আগামী সাত দিন বাসাতেই থাকুন। আর যদি বাসায় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে থাকেন, তাহলে আগামী ১৪ দিন সবাই বাসাতেই সময় কাটান। কোনোভাবেই কেউ বাসার বাইরে যাবেন না। তবে আপনি পৃথক কক্ষে আলাদা করে থাকুন। কারণ, গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের গড়ে পাঁচ দিন কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না।

করোনাভাইরাস অত্যন্ত ছোঁয়াচে। তাই লক্ষণ দেখা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাসায় সাত দিন অবস্থান নিন। বেশি লক্ষণ দেখা দিলে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকুন। এর মধ্যে অবশ্যই নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করে নিতে হবে।

সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখুন:

করোনাভাইরাস রোধে সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা খুব জরুরি। এ ক্ষেত্রে যারা আপনার সঙ্গে একই বাসায় থাকেন না, তাদের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সরাসরি সাক্ষাৎ ও বৈঠক করা থেকে বিরত থাকুন। কোনো কারণে যদি আপনাকে চিকিৎসকের কাছে যেতে হয় বা অন্য কোনো জরুরি কাজে কারও কাছে যাওয়ার দরকার হয় তাহলে ফোন, ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই কাজ সেরে ফেলার চেষ্টা করুন। এ ছাড়া যদি কোনো জরুরি প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে বাইরে যেতেই হয় বা হাঁটতে বেরোতেই হয়, তাহলে অন্য মানুষের কাছ থেকে দুই মিটার দূরত্বে অবস্থান করুন।

দল বেঁধে কেনাকাটা নয়:

কেনাকাটার সময় অন্য ক্রেতা বা বিক্রেতার কাছ থেকে অন্তত দুই মিটার দূরে থাকুন। একা যান। দল বেঁধে কেনাকাটাকে না বলুন। শুধু অত্যাবশ্যকীয় জিনিস কিনুন। কেনাকাটার সময় স্বাস্থ্যসেবায় যারা নিয়োজিত আছেন, তাদের প্রতি ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে সম্মান দেখান। সম্ভব হলে ঘরে বসেই হোম ডেলিভারি নিন।

সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে যারা:

যারা আগে থেকে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগে আক্রান্ত, তারাই করোনাভাইরাসের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে আছে। এ ছাড়া সত্তরোর্ধ্ব যেকোনো ব্যক্তি ও অন্তঃসত্ত্বা নারীও এই ঝুঁকিতে রয়েছে।

কখন বুঝবেন আক্রান্ত:

প্রাথমিক লক্ষণ দেখে আসলে সন্দেহ করা যেতে পারে। নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত কি না, তা লক্ষণ দেখে জানা যাবে না। করোনাভাইরাসের নির্দিষ্ট টেস্ট (পরীক্ষা) ছাড়া তা কোনোভাবেই নিশ্চিত হওয়া যাবে না। কারও এই পরীক্ষার ফলাফল পজিটিভ এলেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে তিনি কোভিড-১৯–এ আক্রান্ত।

আক্রান্ত হলে ফুসফুসে ক্ষতি:

কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে তার ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাশি ও অতিরিক্ত জ্বরের কারণে ফুসফুসে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। এতে ফুসফুসে পানি জমে যায়। অতিরিক্ত পানি জমার কারণে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে না। এতে নিশ্বাসে জটিলতার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে ওই রোগীর মৃত্যু হতে পারে।

ঘরে কেউ আক্রান্ত হলে করণীয়:

ঘরে কেউ আক্রান্ত হলে তাকে ঢিলেঢালা পোশাক পরিয়ে দিন। আলো-বাতাসের প্রবাহ আছে এমন ঘরে তার থাকার ব্যবস্থা করুন। প্রচুর পানি পান নিশ্চিত করুন। প্যারাসিটামল খাওয়ান, আইবুপ্রোফেন নয়। করোনাভাইরাস যেন বাড়িতে না ছড়ায়, সে জন্য আক্রান্ত ব্যক্তিদের আলাদা ঘরে রাখুন। তাদের জন্য আলাদা বাথরুমের ব্যবস্থা করুন। বাসনকোসন, বিছানা ও গামছা-তোয়ালে আলাদা করে দিন। তাদের মাস্ক পরে থাকতে বলুন। যেসব জায়গায় অনবরত হাতের ছোঁয়া লাগে, যেমন দরজার হাতল, শৌচাগার, টেবিল জীবাণুমুক্ত ও পরিষ্কার করুন। পরিবারের সদস্যদের হাত ধুতে হবে বারবার।

মাস্ক পুরোপুরি সুরক্ষা দিতে পারে না:

কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুরক্ষা দেয়, কিন্তু পুরোপুরি নয়। মুখ থেকে বেরিয়ে আসা থুতুর ছিটে বা ড্রপলেট মাস্ক আটকায়। এটাই সংক্রমণের মূল কারণ। যদি আপনাকে সংক্রমিত কারও কাছাকাছি থাকতে হয়, তাহলে রোগ ঠেকাতে মাস্ক সাহায্য করে। আপনার শরীরে যদি করোনাভাইরাসের উপসর্গ দেখা যায় অথবা আপনার যদি করোনাভাইরাস দেখা যায়, আপনার মাস্ক অন্যকে সুরক্ষা দিতে পারে। কিন্তু শহরে ঘোরাফেরার সময় মাস্ক খুব একটা কাজে আসে না, ওতে সুরক্ষাও নিশ্চিত হয় না। চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা সব ধরনের সুরক্ষা উপকরণ নিয়েও আক্রান্ত হচ্ছেন।

শিশুদের থেকেও রোগ ছড়ায়:

অভিভাবকদের জন্য স্বস্তির খবর শিশুদের মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমণের যে উপসর্গ, তা মৃদু। উপসর্গের কোনোরকম প্রকাশ না–ও থাকতে পারে। অনেক তথ্য এখনো অজানা। গবেষণা চলছে।

মৃত্যুর হার ১ শতাংশের কম:

সম্ভবত মৃত্যুর হার ১ শতাংশ বা তার চেয়ে কম। বৈশ্বিকভাবে পরীক্ষার পর যাদের শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে, তাদের মধ্যে মৃত্যুহার ৪ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তবে মৃদু উপসর্গ আছে যাঁদের, তাঁদের অনেকেই পরীক্ষার আওতায় আসছে না। কিন্তু মাত্র ১ শতাংশ মৃত্যু নিয়েও কোভিড-১৯ মৌসুমি ফ্লুর চেয়ে ১০ গুণ পর্যন্ত বেশি প্রাণসংহারী। মৌসুমি ফ্লুতে প্রতিবছর গোটা বিশ্বে ২ লাখ ৯০ হাজার থেকে সাড়ে ৬ লাখ পর্যন্ত মানুষ আক্রান্ত হন। ষাটোর্ধ্ব মানুষের মৃত্যুহার বেশি।

কোনো ভ্যাকসিন নেই:

এখন পর্যন্ত প্রমাণিত সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসাপদ্ধতি বা ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়নি। মানবদেহে ট্রায়াল শুরু হয়েছে। যদি ট্রায়ালের ইতিবাচক ফল আসে এবং নিরাময়ের উপায় খুঁজে পাওয়া যায়, তারপরও বৈশ্বিকভাবে এই টিকার প্রসারের আগে অনেক বাধা ডিঙাতে হবে।

করোনাভাইরাস কেন মহামারি:

যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একই সঙ্গে নতুন কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ে এবং যার বিস্তার রোধ করা সহজে সম্ভব হয় না বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সেই রোগকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করে। এই ঘোষণার সঙ্গে রোগের বৈশিষ্ট্য ও ভয়াবহতার কোনো সম্পর্ক নেই।

image_printপ্রিন্ট করুন
শেয়ার করুনঃ