রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) বরিশালে রিহ্যাবের একজন সদস্যের ওপর সংঘটিত নৃশংস শারীরিক নির্যাতন, সংবেদনশীল অঙ্গে আঘাত, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং জোরপূর্বক স্ট্যাম্প ও চেকে স্বাক্ষর আদায়ের অভিযোগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
রবিবার (৬ জুলাই) দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে রিহ্যাব প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক, ভাইস প্রেসিডেন্ট-৩ এ. এফ. এম. ওবায়দুল্লাহ, পরিচালক প্রকৌশলী মো. মোস্তফা কামাল, পরিচালক হাবিবুর রহমান হাবিব, পরিচালক পরিচালক শেখ কামাল এবং পরিচালক মো. এমদাদুল হোসেন সোহেল সহ অন্যান্য রিহ্যাব সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে ড. আলী আফজাল বলেন, সম্প্রতি বরিশালে রিহ্যাব সদস্য, বাকলা ডেভেলপার্স প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান এবং অগ্রণী হাউজিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল আজিজ হাওলাদারের ওপর সংঘটিত নির্যাতনের ঘটনা শুধু একজন উদ্যোক্তার ওপর হামলা নয়, বরং দেশের নিরাপদ ও ভয়ভীতিমুক্ত ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপরও একটি গুরুতর আঘাত। তিনি বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গৃহীত পদক্ষেপ রিহ্যাব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। ভিডিওতে প্রকাশিত দৃশ্যগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং সভ্য সমাজে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট বলেন, এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কয়েকজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে, যা প্রশংসনীয়। তবে একই সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের দ্রুত জামিনের চেষ্টা এবং ভুক্তভোগীকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তবে তা বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হবে।
তিনি প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা কোনো ধরনের ভয় বা চাপ ছাড়াই আইনি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন।
ড. আলী আফজাল বলেন, রিহ্যাব দেশের আবাসন খাতের সর্ববৃহৎ সংগঠন। এই খাতের উদ্যোক্তারা হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ করছেন, প্রায় ৫০ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছেন এবং দেশের পরিকল্পিত নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। আবাসন খাতের সঙ্গে প্রকৌশলী, স্থপতি, নির্মাণ শ্রমিক, ঠিকাদার, সরবরাহকারী, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ অসংখ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সম্পৃক্ত। ফলে এ খাতের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর ভয়ভীতি, জোরজবরদস্তি, চাঁদাবাজি, শারীরিক নির্যাতন কিংবা সহিংসতার মাধ্যমে কোনো দাবি আদায়ের সংস্কৃতি কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ব্যবসায়িক বা আর্থিক বিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু তা নিষ্পত্তির জন্য দেশে আইন, আদালত ও বিচারব্যবস্থা বিদ্যমান। একইভাবে কোনো ডেভেলপার বা উদ্যোক্তা আইন লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধেও অবশ্যই প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক পরিচয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কি না, সেটি রিহ্যাবের বিবেচ্য বিষয় নয়। রিহ্যাব ব্যক্তি নয়, অপরাধকে দেখে। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়াই একটি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি।
তিনি আরও বলেন, দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে নিরাপদ রাখতে উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। উদ্যোক্তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হলে তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করবে।
সংবাদ সম্মেলনে রিহ্যাব সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগের প্রতি চার দফা দাবি তুলে ধরে। দাবিগুলো হলো— ঘটনার নিরপেক্ষ, দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা; অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ; ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; এবং ভবিষ্যতে আবাসন খাতের উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক। আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রিহ্যাব সবসময় আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দেশের আবাসন খাতের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করে যাবে।
রিহ্যাব আশা প্রকাশ করে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় এনে এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, যাতে ভবিষ্যতে দেশের কোনো উদ্যোক্তা এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার শিকার না হন এবং বিনিয়োগবান্ধব, নিরাপদ ও ভয়ভীতিমুক্ত ব্যবসায়িক পরিবেশ আরও সুদৃঢ় হয়।
